Nakshi kantha

নকশি কাঁথা

নকশি কাঁথা


নকশিকাঁথার ইতিহাস:

নকশি কাঁথা শৌখিন মানুষের এক পরম সম্পদ। নকশি কাঁথা শত শত বছরের পুরনো ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের সংস্কৃতির একটা অংশ। জসীম উদ্দীন যে নকশি কাঁথার কথা তার কবিতায় তুলে ধরেছেন সে নকশি কাঁথা বাঙালির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আবহমান কাল ধরে নকশি কাঁথায় যে শিল্পকর্ম ফুটে ওঠেছে তা বাংলার শিল্প, সংস্কৃতি, সমাজ, প্রকৃতির প্রাচীন ঐতিহ্য।

কবে থেকে নকশি কাঁথার জন্ম তার নির্দিষ্ট দিনক্ষণ আমরা জানি না তবে সেই প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালি নকশি কাঁথা সেলাই করে আসছে। হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্যলালিত আমাদের নকশি কাঁথা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাথে নকশি কাঁথা প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে আছে। । নানা আকারে ধর্মীয় লোক কথা, জীবন ও জগতের নানা রহস্যাবৃত বিষয়াদী ফুটিয়ে তোলা হতো কাঁথায়। সময়ের পালাবদলে পরিবর্তন এসেছে নকশি কাঁথার নকশাতেও। জীবন ও জগতের ব্যাখ্যাও ফুটিয়ে তোলা হতো নকশি কাঁথায়। বিভিন্ন দেশের মিউজিয়ামেও সংরক্ষিত রয়েছে বাংলার নকশী কাঁথা।

নকশি কাঁথা  : কাপড়ের উপর তৈরি নকশা করা কাঁথাই নকশি কাঁথা।, সূক্ষ্ণ হাতে সুচ আর বিভিন্ন রঙের সুতায় গ্রামবাংলার বউ-ঝিয়েরা মনের মাধুরী মিশিয়ে নান্দনিক রূপ-রস ও বৈচিত্রের যে কাঁথা বোনেন, তা-ই নকশি কাঁথা। জীবন ও জগতের নানা রূপ প্রতীকের মাধ্যমে ফুটে উঠে নকশি কাঁথায়। আবহমান কাল ধরে নকশি কাঁথায় যে শিল্পকর্ম ফুটে ওঠেছে তা বাংলার শিল্প, সংস্কৃতি, সমাজ, প্রকৃতির প্রাচীন ঐতিহ্য। নকশি কাঁথা সাধারণত দুই পাটের অথবা তিন পাটের হয়ে থাকে। চার-পাঁচ পাটের কাঁথা শীত নিবারণের জন্য ব্যবহৃত হয়। তাতে কোন কারুকার্য থাকে না। কাঁথাকে মেঝের ওপর তুলে ধরে তার উপরে বসে কাঁথা সেলাই করতে হয়। সাধারণত পুরনো কাপড়ের পাড় থেকে সুতা তুলে অথবা হাট হতে তাঁতিদের কাছ থেকে বাহারি সুতা কিনে যেমন: লাল, নীল, সবুজ, বেগুনি, হলুদ প্রভৃতি সুতা কিনে এনে কাঁথা সেলাই করা হয়। বিভিন্ন অঞ্চলে ফোঁড়, পাড় ও নকশা অনুযায়ী নকশি কাঁথা ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন: বরকা ফোঁড়, তেজবি ফোঁড়, বাঁশপাতা ফোঁড়, কইতা ও বিছা ফোঁড় ইত্যাদি। পাড়ের নামেও আছে বৈচিত্র্য। যেমন: তোলা পাড়, তাস পাড়, নয়নলতা, নারিকেল পাতা ও নৌকা বিলাসসহ বিভিন্ন নামের নকশি কাঁথা রয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশে নানা রকমের কাঁথা রয়েছে।  সুই-সুতার মাধ্যমে আপন মনের ইচ্ছায় পরিবেশের চারপাশের ফুল, পাতা, পাখি, পশু ও দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসপত্র কাঁথায় প্রতিফলিত হয়। কাঁথাশিল্পী নিজেই এর রূপকার ও কারিগর। অধিকাংশ সময় কাঁথার নকশা মোটেও না এঁকে সরাসরি সুই-সুতা চালিয়ে একেকটি কাঁথা তৈরি করেন তারা। বিভিন্ন রঙের সুতা দিয়ে মনের মাধুরী মিশিয়ে কাঁথাগুলো এফোঁড়-ওফোঁড় করে অনুপম রসের আবহ তৈরি করেন। এ ধরনের কাঁথা একটিই হয়। একটির সঙ্গে অন্যটির মিল কখনোই খুঁজে পাওয়া যাবে না। কাঁথাফোঁড়ের আবার বৈচিত্র্য আছে এবং সে অনুযায়ী এর দুটি নাম হয়েছে: চাটাই বা পাটি ফোঁড় এবং কাইত্যা ফোঁড়। নকশার সঙ্গে সমন্বয় সাধনের জন্য ফোঁড়ের দৈর্ঘ্য কখনও কখনও বড়-ছোট হয় এবং তখন তাকে তাঁতে বোনা শাড়ির পাড়ের অবিকল নকল বলে মনে হয়। কাঁথা হচ্ছে মিতব্যয়িতার একটি দৃষ্টান্ত, কারণ এ ক্ষেত্রে পুরনো কাপড় একত্র করে নতুন কিছু একটা তৈরি করা হয়। তাছাড়া পুরনো কাপড়ের একটা অলৌকিক ক্ষমতা আছে বলে মনে করা হয়- তা হলো কারও কুদৃষ্টি প্রতিহত করা। কাঁথা মোটিফগুলির মধ্য দিয়ে শিল্পিমনের বিভিন্ন আবেগ ও অনুভূতি প্রতিফলিত হয়। কাঁথায় যে পৌনঃপুনিক মোটিফগুলি দেখা যায় তার অনেকগুলি বিভিন্ন উৎসব ও ব্রত উপলক্ষে অঙ্কিত  আলপনা শিল্পেও ব্যবহূত হয়। এ মোটিফগুলি সূচিশিল্পীর সুখ, সমৃদ্ধি,  বিবাহ এবং মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত করে।

নকশি কাঁথার বাণিজ্যিক রূপ: নকশি কাঁথার বাণিজ্যিক ব্যবহার বেশি দিনের নয়। সাম্প্রতিক সময়ে এসে নকশি কাঁথা তার বাণিজ্যিক রূপ লাভ করে। প্রথম দিকে মানুষ তার নিত নৈমিত্তিক প্রয়োজনেই কাঁথা সেলাই করত।

এ দেশের জামালপুরের বকশীগঞ্জ, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, মাদারগঞ্জ, মেলান্দহ, যশোর, ফরিদপুর, সাতক্ষীরা অঞ্চলে নকশি কাঁথা বেশি তৈরি হয়ে থাকে। তা ছাড়া ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, রাজশাহী, বরিশাল, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সিলেটে নকশি কাঁথার বাজার ও ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। তাই বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি নকশি কাঁথা তৈরি হয় জামালপুরে।

আন্তর্জাতিক বাজারে নকশিকাঁথা: সারাবিশ্বে এখন নকশি কাঁথার বিশেষ বাজার তৈরি হয়েছে। পাচ্ছে। বাংলাদেশের নকশি কাঁথার উন্নত গুণগত মান ও মূল্য তুলনামূলক কম হওয়ায় বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নকশি কাঁথার বিশেষ বাজার সৃষ্টি হচ্ছে। ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যেও নকশি কাঁথা রফতানি হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.